সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বেঁচে থাকার গল্প


পাশে বসে অভি রংপেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকছে, জয়া তার বাবার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। বাবা রেগেমেগে বলছেনকী, এখন কেন এসেছিস? পালিয়ে যাওয়ার সময় মনে ছিল না? ভেবেছিস কি তুই? বাবার আমি কলিজার টুকরা, আজ না মানুক একদিন ঠিকই মেনে নেবে কোনদিন না। মরে যা, জাহান্নামে যা; আর কক্ষনো আমার কাছে আসবি না... 
অভি ওর আঁকা ছবিটি নিয়ে এসে বাবাকে দেখিয়ে বললো
নানু দেখ, এটা বাবা, এটা মা, এটা আপু আর এটা... 
বাবা বিরক্তি প্রকাশ করে খুব জোরে আঁকা খাতাটিসহ অভির হাত সরিয়ে দিলেন। আর তখনই একটু চমকে জয়ার ঘুম ভাঙ্গলো
 ঘুম ভেঙ্গেই অন্ধকারে পাশ ফিরে সে অভিকে জড়িয়ে ধরলো জয়ার মন বিষাদে ছেয়ে গেল
জয়া নিয়মিতই বিচিত্র রকম স্বপ্নে তার বাবাকে দেখে। সেই স্বপ্ন গুলো কখনোই সুখকর হয় না। কদিন আগের এক স্বপ্নে দেখেছিল উঁচু একটি ভবনের রেলিংয়ে সে ঝুলে আছে; চিৎকার করে বাবাকে ডাকছে। বাবা পাশে গম্ভীর মুখে তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন; তাকে বাঁচানোর কোন রকম চেষ্টা করছেন না! 
আজকের দিনটি জয়ার বিশেষ দিন
 আজ সে নতুন করে সংগ্রাম শুরু করার জন্য কুমারখালী থেকে কুষ্টিয়া সদরে যাচ্ছে। আজকেও বাবাকে স্বপ্নে এসে এভাবে বলতে হবে?
জয়ার চোখ ভিজে এলো
, সে ছেলের আরেকটু কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। চারদিক নিস্তব্ধ, এরমধ্যে শুধু পাশে শুয়ে থাকা গভীর ও শান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন সাজ্জাদের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ জয়ার কানে আসতে লাগলো।   
জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি নিয়ে জয়া একদমই ভাবতে চায় না
, কিন্তু কঠিন বর্তমান ও ভীতিকর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাকে বারবার অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। 
জয়া ভাবতে লাগলো কেমন হতো তার জীবন যদি বাবার অবাধ্য হয়ে সাজ্জাদকে সে বিয়ে না করতো। বাবা নিশ্চয়ই খুব ভালো একটি ছেলের সাথেই তার বিয়ে দিতেন। অভি
-তুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়ই তাকে অতো ভাবতে হতো না। 
প্রেমের অমোঘ টান তো ছিলই এছাড়াও বেকার সাজ্জাদের সাথে ভবিষ্যৎ জীবন কাটাতে চাওয়ার পেছনে জয়ার যুক্তি ছিল- বেকার হলেও সাজ্জাদ তো অনার্স পাস
, কোন না কোন চাকুরী তো হবেই। বিয়ের পর জয়া জানতে পারলো সাজ্জাদ অনার্স পাস করেছে তৃতীয় বিভাগ নিয়ে
 এসএসসি-এইচএসসিতেও তার রেজাল্ট খুবই সাদামাটা আর যেটিকে জয়া চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল - যতো সমস্যাই আসুক ভালোবাসার শক্তি দিয়ে সেগুলোর সে মোকাবেলা করবে; বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই সে বুঝে গেল সেই চ্যালেঞ্জ জেতা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সম্ভব নয় কারণ যেটিকে জয়া সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ভেবেছিল সেই ভালোবাসাটাই যে তাদের সংসার থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকলো। 
প্রেমে পড়লে সচরাচর যে রোগটির দ্বারা অনেকেই আক্রান্ত হয় তা হলো হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাওয়া
 সাজ্জাদের সাথে প্রেমের দিনগুলোতে জয়াকেও সেই রোগে পেয়ে বসেছিল। 
বিয়ের পর সবকিছুই জয়ার দুঃস্বপ্নের মত মনে হতো
, যেন ঘুম ভাঙ্গলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দুঃস্বপ্নই বটে! একটি মেয়ে সবার কথা অমান্য করে বাড়ি থেকে পালিয়ে একটি ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করলো কিন্তু উদ্যমহীন-অলস সেই ছেলেটি মেয়েটির মৌলিক চাহিদাগুলো পূরনেও সাংঘাতিক উদাসীন। আর তার কী সীমাহীন আত্মমর্যাদা বোধ! ছোট কোন চাকুরী তিনি করবেন না, এতে তার সন্মান থাকবে না। 
বড় ভাইয়ের প্রতি সাজ্জাদের অগাধ শ্রদ্ধা। ভাইয়ের সন্তানদের প্রতিও স্নেহের কোন কমতি নেই
 মাঝে মধ্যেই তারা অনেক রকম আবদার নিয়ে আসে। সাজ্জাদ তখন অনুনয়ের সুরে জয়াকে বলেদাও না প্লিজ, আমরা না দেখলে এদের আর কে দেখবে?
বড়ভাই, তার পরিবারের প্রতি সাজ্জাদের এমন উছলে পড়া দরদের কারণ - ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর বড়ভাই-ই তাকে মানুষ করেছে। ভাইয়ের কাছে যখন যা চেয়েছে তাই পেয়েছে; ভাই কখনো তাকে না করেন নি।
কিন্তু ভাই যে পরিবারের জমি জমা বিক্রি করে দিয়ে তাকে টাকা দিচ্ছিলেন; সেই টাকায় নিজে আভিজাত্যময় জীবন যাপন করছিলেন সে দিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। অনেক পরে এসে অবশ্য বড় ভাইয়ের বোধোদয় হয় 
সেবার জমি বিক্রি করে টাকা তিনি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখলেন, কিন্তু ততদিনে বাড়ির ভিটেটি ছাড়া সব জমি শেষ হয়ে গিয়েছে। 
জয়াকে অনেকেই এটা নিয়ে পরামর্শ দিত
; জয়ারও মনে হতে লাগলো যে, সংসারে একটি বাচ্চার খুব প্রয়োজন। সংসারে বাচ্চা এলে পুরুষ মানুষ সংসারী হয়। ঘর আলো করে তুলির জন্ম হলো। মেয়েকে পেয়ে সাজ্জাদও ভীষণ খুশি
 মেয়ের সাথে খেলার সময় সাজ্জাদের আগের সেই প্রাণখোলা হাসি জয়া আবার দেখতে পেল। জয়া ভাবলো, মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবার বুঝি তার স্বামীর উদাসীনতার অবসান ঘটবে সে অধীর অপেক্ষায় থাকতো - কোন একদিন ঘুম থেকে উঠে সাজ্জাদ বলবেটাকার জন্য মেয়ের ভালো যত্ন হচ্ছে না, আমাকে টাকা ইনকাম করতে হবে 
দিন আসে দিন যায়
, জয়া অপেক্ষায় থাকে, কিন্তু সেই দিনটি আর আসে না। জয়া বুঝে যায়; যা করার তাকেই করতে হবে। সে স্থানীয় একটি প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলো। তুলির বছর চারেক পরে এলো অভি। 
জয়ার জীবনে বড় একটি দুর্যোগ নিয়ে এসেছিল তার বাবার মৃত্যু। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা গেলেন
, তুলি তখন গর্ভে
 বাবার হঠাৎ ওভাবে চলে যাওয়া জয়া এখনো মেনে নিতে পারে না। এমন অভিযোগ কেউ কখনো করে নি কিন্তু তবুও সে প্রতিনিয়ত উপলব্দি করে বাবার মৃত্যুর জন্য সে-ই দায়ী। তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুঃশ্চিন্তায় বাবা শেষ পর্যন্ত আর সামলে উঠতে পারেন নি। বাবা মারা যাওয়ার পর জয়া সত্যিকার ভাবে উপলব্দি করা শুরু করে, বাবা তার জীবনে কী ছিলেন। 
জয়া সবসময়ই বাবার কথা ভাবে
, বাবার বয়েসীদের দেখলেই সে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে
 বাবার সাথে শুধু উচ্চতা আর শারীরিক গড়নের একটু মিল থাকায় কখনো সাজ্জাদের বড় ভাইয়ের মধ্যেও সে তার বাবাকে খুঁজে পায় 
সাজ্জাদ যখন আয়েশি ভঙ্গীতে সিগ্রেট টানে - জয়া তন্ময় হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে সাজ্জাদ বাকীসব ধূমপায়ীদের মতই সিগ্রেটের ধোঁয়া টেনে ছেড়ে দেয় - এতে আলাদা কিছু নেই, কিন্তু সেখানেও জয়া তার বাবাকে খুঁজে পায় এমন আয়েশি ভঙ্গীতে সে তার বাবাকে সিগ্রেট টানতে দেখেছিল কিনা।
আগে জয়া নানা প্রয়োজনে তার মা-ভাইয়ের কাছে যেত
; মা কখনো তাকে খালি হাতে ফেরাতেন না। কিন্তু যখন থেকে মা খুব সুক্ষ্ণভাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে সাজ্জাদের মত একটি বাজে ছেলেকে বিয়ে করার খোঁটা দেয়া শুরু করলেন তখন থেকে জয়া তার মায়ের কাছে যাওয়া বন্ধ করে দিল। এরপর মা এসে কিছু দিতে চাইলেও সে নিত না। বাবার অত্যন্ত আদরে বড় হওয়া মেয়েরা বড্ড অভিমানী স্বভাবের হয়।   
অতীত ভাবতে ভাবতে একসময় পাখির কিচিরমিচির জয়ার কানে এলো
 সে বিছানা ছেড়ে উঠলো অভি বললোমা, আজ না গেলে হয় না? আমার একদম যেতে ইচ্ছা করছে না জয়া প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। অভির মত করে পরে তুলিরও একই কথা - তারও যাওয়ার ইচ্ছে করছে না। 
এই সুযোগে সাজ্জাদ বললো
বাড়ি থেকে আমাদের কারোরই যাওয়ার ইচ্ছে করছে না আমাদের সাবাইকে তুমি ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিয়ে যাচ্ছো। কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? 
জয়া শান্তভাবে জবাব দিল
তুমি তো সবই জানো, শুভ অনেক কষ্ট করে উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের চাকুরীটা জোগাড় করে দিয়েছে আজ কালের মধ্যে জয়েন করতে না পারলে ওরা অন্য কাউকে নিয়ে নেবে শুভর কথা শুনেই সাজ্জাদ একটু রেগে গেল, কিন্তু নিজেকে সে সংযত করলো। শুভংকর রায় - এই হিন্দু ছেলেটার সাথে জয়া প্রায়ই অনেক সময় নিয়ে মোবাইলে কথা বলে, যা ওর এক্কেবারে পছন্দ নয়। কলেজে একসাথে পড়েছিস ভালো কথা কিন্তু তোর সেই বান্ধবী যে এখন আরেকজনের বউ এটা তুই বুঝবি না, অন্যের বউয়ের সাথে কিসের এত কথা শালা মালাউন - সাজ্জাদ নীরবে অনেকবার শুভংকরকে গালিগালাজ করেছে কিন্তু তাকে প্রকাশ্যে কখনো কিছু বলে নি কিংবা বলার সাহস হয় নি। কারণ সে জানে, আর্থিক অনটনের দিনগুলোতে শুভংকরের ধারের টাকায় তাদের সংসার চলে। আর আজ তো শুভংকরকে ইস্যু করে মোটেই রাগ দেখানো চলে না হাজার হোক কুষ্টিয়া শহরের বেশ ভালো একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সে জয়ার চাকুরী পাইয়ে দিয়েছে।  বিছানায় বসেই সিগ্রেট ধরিয়ে সাজ্জাদ ভাবে- না, কুষ্টিয়া যাওয়াই ভালো। সেখানে গেলে পরিচিতরা নানা ছুতোয় ছেলে মেয়েরা বড় হচ্ছে - এটা করো ওটা করো বলে উপদেশ দিতে পারবে না। অভি-তুলিরাও ভালো স্কুলে পড়তে পারবে।
সাজ্জাদকে আত্মীয় অনাত্মীয় সবাই শুধু কিছু করার উপদেশ দেয় সে ভাবে, কিছু না - সে বড় কিছুই করবে কিন্তু বড় কিছু করার জন্য আগে ভাবনা চিন্তা করার প্রয়োজন আছে বৈ কি এবং তার জন্য কিছু সময় দরকার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হয়ে গেল কিন্তু এখনো সাজ্জাদের ভাবনা চিন্তা করে কাজে হাত দেয়া হলো না 
মনির উদ্দিনও আজকাল বড্ড বাড় বেড়েছে। সে সরাসরি কিছু বলে না
, কিন্তু সাজ্জাদ যে বউয়ের টাকায় খাচ্ছে সেই খোঁটা দেয়ার জন্য মাঝে মধ্যেই ইনিয়ে বিনিয়ে জয়ার প্রশংসা করে জয়া সংসারের জন্য কি খাটাটাই না খাটছে, সকালে স্কুলে পড়িয়ে আবার বিকালবেলা টিউশন! সাজ্জাদ কপাল গুনে এমন ভালো বউ পেয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি...। 
সাজ্জাদ মনিরকে কিছু বলতে পারে না কারণ মনিরের দোকানে বাকিতে তাকে চা সিগ্রেট খেতে হয়। সাজ্জাদ প্ল্যান করতে থাকে
 কুষ্টিয়া যাওয়ার আগে বকেয়া টাকা শোধ করে দিয়ে মনিরকে কিভাবে একটু শায়েস্তা করে যাওয়া যায় পরক্ষণেই আবার খালেদা ভাবী মানিক চাচাসহ আরও বেশ কয়েকজনের কথা তার মনে পড়ে এরা সাজ্জাদের প্রতিবেশী, এরা সবাই নানা ভাবে তাকে নিয়ে টিটকিরি করে কতজনকে শায়েস্তা করবে সে?  

কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে ছেলে মেয়েরা মুখ গোমরা করে ছিল কিন্তু নতুন বাসা দেখে ওরা দু
জনেই খুব খুশী হলো। আজকের মত দিনে সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়ায় এতো সুন্দর বাসা! - বাসা দেখে শুভংকরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় সাজ্জাদের রাগ আরেকটু পড়লো।                    
বাসার মালিক বছর ষাটেকের এক মহিলা নিচের দুই তলা ভাড়া দিয়ে কাজের মেয়েকে নিয়ে তৃতীয় তলায় তার বাস। স্বামী নেই, দুই ছেলে চাকুরী সূত্রে বউ নিয়ে থাকে অন্য জায়গায় মহিলাটি এসে দুএকটি কথার পরই শুভংকরের কথা বলা শুরু করলেন এই বাসা তিনি ছয় হাজার টাকার কমে ভাড়া দেন না; শুভংকর অনেক পীড়াপীড়ি অনেক অনুরোধ করাতে দেড় হাজার টাকা কম করেছেন, শুভংকর তার ছেলের বন্ধু, সেই ছোট বেলা থেকে তার এই বাড়িতে যাওয়া আসা, তার অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেন নি, এত কম ভাড়ায় এত ভালো বাসা কুষ্টিয়া শহরে আর একটিও পাওয়া যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব শুনে সাজ্জাদের মেজাজ আবার বিগড়ে যেতে লাগলো
ওদিকে জয়া আবার মোবাইলে একজনকে বলতে শুরু করলো - বাসার সবকিছু ঠিক আছে, খুব পছন্দ হয়েছে, কোন সমস্যা নেই... কার সাথে কথা বলছে সে? নিশ্চয় শুভংকর? এই বাসা পেতে শুভংকরের প্রচ্ছন্ন প্রভাব তার পুরুষ অহংবোধে এবার একটু আঘাত হানলো 
বাড়িওয়ালী যাওয়ার সময় জয়াকে ঘরের চার জায়গায় চারটি
 পেরেক দেখিয়ে দিয়ে বললেন মশারী টাঙ্গানোর জন্য ঘরের আর কোথাও যেন পেরেক ঠুকানো না হয় 


নতুন বাসায় নতুন ভাবে জয়ার সংসার শুরু হলো। মনে আশা, নতুন পরিবেশে এসে হয়তো সাজ্জাদের চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন আসবে; সে সংসারের হাল ধরার কথা ভাববে। সাজ্জাদ জয়ার আশা পূরণ করলো; তবে অন্যভাবে, যা সে একেবারে চায় নি। নতুন পরিবেশে এসে মাস খানেকের মধ্যে সত্যিই সাজ্জাদের ভাবনায় পরিবর্তন এলো। সে সংসারের হাল ধরার কথা ভাবলো। এক সকালে সাজ্জাদ রান্না ঘরে ঢুকে জয়াকে বললোতুমি চুলায় ভাত চাপিয়ে দাও, আমি সবজি কেটে দিচ্ছি
পত্রিকায় ভালো স্বামী স্ত্রীর কাজে সাহায্য করেন শিরোনামে লেখালেখি হয় কিন্তু অন্য কোন কাজ না করে বাড়িতে বসে থেকে রান্না করা-বাসন মাজা ভালো স্বামী কে চায়? একদিন বাইরে থেকে বাসায় ফিরে জয়া দেখলো সাজ্জাদ বালতিতে পানি নিয়ে ভেজা কাপড় দিয়ে আপন মনে ঘরের মেঝে পরিষ্কার করছে। জয়া রেগেমেগে একটু ধমকের সুরে বললোকে বলেছে তোমাকে এসব করতে, কেন করছো তুমি এসব? সাজ্জাদ সরল ভঙ্গিতে জবাব দিলমেঝেতে বেশ ধুলো জমে গিয়েছিল, তাই ভাবলাম... জয়ার দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়লো তার এই আত্মমর্যাদাহীন-পরাজিত স্বামীকে দেখে। 
জয়া উপলব্দি করতে শুরু করলো তার সব
 
হ্যাঁ-তেই সাজ্জাদের হ্যাঁ, সব না-তেই সাজ্জাদের না কোন কিছুতেই তার স্বামীর নিজস্ব কোন মত নেই, নেই কোন দ্বিমতও সময়ের সাথে সাজ্জাদের স্বামী সুলভ বিষয়গুলো হারিয়ে যেতে থাকলো। জয়ার চলা ফেরা, রাতে কোনদিন দেরি করে বাড়ি ফেরা - কোন কিছুতেই তার কোন লাগাম নেই কিন্তু এই লাগামহীনতা, স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া অবাধ স্বাধীনতা জয়ার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো। নিজেকে তার অভিভাবকহীন মনে হতে লাগলো।
বাসার প্রতিটি কোণ
, জয়ার টাকায় অনেক কষ্টে কেনা ছোট বড় প্রতিটি আসবাব; সংসারে কোন ভাবেই অবদান রাখতে না পারা সাজ্জাদকে যেন সুক্ষ্ণভাবে খোঁচা দিচ্ছিল
 সেই খোঁচার ফলাফল সাজ্জাদের এই শান্তশিষ্ট পত্নিনিষ্ট ভদ্র লোক বনে যাওয়া।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে জয়ার সমস্যাগুলোও বাড়তে শুরু করলো। মাস ছয়েক যেতে না যেতেই বাড়িওয়ালী একদিন এসে বললেন, তার পোষাচ্ছে না; বাড়ি ভাড়া এক হাজার টাকা বেশি করে দিতে হবে। বাড়তে থাকা সংসারের খরচ, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনা ও মানসিক চাপে জর্জরিত হয়ে জয়ার নানা রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে শুরু করলো। শুভংকরের পীড়াপীড়িতে টেষ্ট করে জানতে পারলো তার টাইপ টু ডায়াবেটিস মেলিটাস ধরা পড়েছে! 
সাজ্জাদ অন্য কিছু না করে বাসায় বসে রান্না বান্না ঘর ধোঁয়া মোছার কাজ করে - স্কুলে এসব নিয়ে কলিগদের ফিসফাস ব্যঙ্গ বিদ্রুপ জয়ার কানে আসতে থাকে
 চারপাশের সবকিছুই তার অসহ্য হতে শুরু করে। 
মাঝে মধ্যে আবার ছোট ছোট আপাত দৃষ্টিতে খুব তুচ্ছ বিষয়ও জয়াকে অনেক সুখী করে তোলে এক ছুটির দুপুরে সে দেখলো সাজ্জাদ, অভি, তুলি এক বিছানায় খুব আরাম করে ঘুমচ্ছে। স্বামী-সন্তানদের এই সাধারণ ঘুমনোর দৃশ্যটিও তার মন ভরিয়ে দিল ঘুমে আচ্ছন্ন সাজ্জাদকে দেখে গভীর মমতায় জয়া ভাবলো, সব স্বামীই তার স্ত্রীর জন্য করে সে না হয় তার স্বামীর জন্য করছে - এটাও কি কম গর্বের? এই তার পরিবার, এদের জন্য অসহনীয় কষ্ট নিয়েও পৃথিবীতে বেঁচে থাকা যায় এক মূহুর্তের জন্য জয়ার মনে হলো - তার চেয়ে ভাগ্যবতী তার চেয়ে সুখী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই 

গত কয়েকদিন
 ধরেই জয়া একটু রাত করে বাড়ি ফিরছিল সেদিন সে বেশ খুশি খুশি ভাব নিয়ে বাসায় ফিরে দুএকটি কথার পর সাজ্জাদকে জানালো, ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যাবাকো কোম্পানীতে শুভংকর তার জন্য খুব ভালো একটি চাকুরীর বন্দোবস্ত করে দিয়েছে বেতন ত্রিশ হাজার টাকা, আগামী মাসেই জয়েন করতে হবে!   
জয়ার এই খুশির খবরটি সাজ্জাদকে স্পর্শ করলো না। প্রসঙ্গ পাল্টে বেশ ভাবুক ভঙ্গিতে সে বললো
অনেকদিন কুমারখালী যাওয়া হয় না, কাল সকালবেলা আমি কুমারখালী যাবো। যাই কয়েকদিন থেকে আসি 
কুমারখালী যাওয়ার সপ্তাহখানেক পর সাজ্জাদ ফোন দিয়ে জানালো সে আর কুষ্টিয়ায় ফিরবে না
, কুমারখালীতেই কিছু একটা করার চেষ্টা করবে। সাজ্জাদকে ফেরাতে জয়া অনেক অনুরোধ করলো, কিন্তু সে তার কথা শুনলো না।
এর মধ্যে জয়ার মা এসে জয়াকে একটি সংবাদ দিলেন
 সাজ্জাদের বড়ভাই এলাকায় সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন - জয়া কুষ্টিয়া শহরে একটি হিন্দু ছেলের সাথে পরকিয়ার সম্পর্কে লিপ্ত, আর সেই দুঃখেই সাজ্জাদ কুষ্টিয়া ছেড়ে কুমারখালী চলে এসেছে। এমন চরিত্রহীনা একটা মেয়ের সাথে তারা আর কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না। 

জয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল তার বিরুদ্ধে এমন ভয়ংকর একটি অভিযোগের কথা শুনে
 যেন পায়ের নিচ থেকে তার মাটি সরে গেল। কথাটি তুলির কানেও এলো, অনেক প্রশ্ন জন্ম নিলো তার মনে। এগারো বছর বয়েস - সে এখন অনেককিছুই বুঝতে পারে 
জয়ার মা অনেক কাকুতি মিনতি
, অনেক অনুরোধ করে তাকে কুমারখালী যেতে বললেন। সেই সাথে নানা রকম প্রস্তাব; তুলি-অভিকে বাইরে ভালো বোডিং স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন; সব খরচ তিনি বহন করবেন। সংসার খরচের জন্য প্রতি মাসে জয়াকে টাকা পাঠিয়ে দেবেন। 
জয়া বুঝতে পারলো ভীষণ শক্ত এক সমস্যার জালে সে আটকে যাচ্ছে।
পরদিন সন্ধ্যায় তুলিকে নিয়ে কোচিং থেকে বের হওয়ার মুখে একটি মেয়ে জয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটি বললোতোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে। জয়া হেসে বললোআরে মনিকা! তুমি এখন! কোথায় যাচ্ছো, শুভ কোথায়?
আমায় দেখে অবাক হলে যে? কেন, আমি কি সন্ধ্যার পর একা বাড়ি থেকে বেরুতে পারি না? নাকি সন্ধ্যার পর শুধু তোমার মত খারাপ মেয়েরাই বাড়ির বাইরে যায়। - মনিকার জবাবে জয়ার হাসিমুখ মূহুর্তে ম্লান হয়ে গেল অপ্রস্তুত হয়ে তুলির দিকে একবার তাকিয়ে বিষ্ময়ে চোখ বড় করে সে বললো এসব তুমি কি বলছো মনিকা?
মনিকা এবার একটু চেঁচিয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে বললো
কী বলছি বুঝতে পারছ না? নষ্টা মেয়ে কোথাকার ঘরে নিজের স্বামীকে রেখে অন্য আরেক জনের স্বামীর সাথে প্রেম করে বেড়াচ্ছো। মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সংসার ভাঙ্গতে লজ্জা করে না 
জয়া মনিকার কথার নুন্যতম প্রতিবাদও করতে পারলো না
 শুভংকরের সাথে ওভাবে মেলামেশা মনিকাও ভালোভাবে নেয় নি! সে বেশ বুঝতে পারলো মনিকার এরকম আচরণের কারণ কিন্তু এভাবে অপমান করার আগে এ কথা সে তাকে একবার বলতেও তো পারতো
সেখানে কৌতূহল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন বাচ্চার অভিভাবক আর তুলির সামনে এমন বিশ্রীভাবে হেনস্থা হয়ে লজ্জায়-অপমানে জয়ার চোখে পানি এলো। তাদের চারপাশে ছোট একটি জটলার মত তৈরি হলো
, কিন্তু মনিকা কাউকে পরোয়া না করে জয়াকে একনাগানে কটুক্তি করেই চললো। 
ত্রাতা হয়ে এলো শুভংকর
 সেখানে দ্রুত বেগে আসা একটি রিকশা থেকে নেমে সে অগ্নিশর্মা মনিকাকে জোর করে টেনে রিকশায় তুলতে তুলতে জয়াকে বললোকিছু মনে করো না, এর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তুমি বাসায় যাও রিকশায় উঠে যেতে যেতেও মনিকা কটুক্তি করেই চললো। জয়া মূর্তির মত সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।
বাসায় ফেরার পথে তুলি হঠাৎ রেগেমেগে বলা শুরু করলো
তুমি খারাপ মেয়ে, তাই বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আমি তোমার সাথে আর থাকবো না, আমি বাবার কাছে যাবো তুলির কথা শুনে রিকশাওয়ালা কৌতূহল নিয়ে কয়েকবার পেছনে তাকালো
বাসায় ফেরার পর তুলি কুমারখালীতে তার বাবার কাছে ফেরার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিল। পরদিন সকালবেলা সাজ্জাদের ভাইয়ের ছেলে আসলো তুলিকে নিয়ে যেতে
   
জয়া সেদিন আর পড়াতে গেল না
, সারাদিন বিষণ্ণমনে বাসায় বসে রইলো। কঠিন পৃথিবী হঠাৎ করেই যেন তার কাছে আরো কঠিনতর হয়ে গেল
ছোট্ট অভির এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই, নিজের জগতে সে মহা ব্যস্ত! কাগজে রংপেন্সিল ঘষে সে তার পরিবারের ছবি এঁকে মাকে দেখিয়ে বললোমা দেখ, এটা বাবা, এটা তুমি, এটা আপু আর এটা আমি অভি প্রশংসা শোনার জন্য মৃদু হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো কি নিষ্পাপ-পবিত্র এই হাসি। জয়া পরম স্নেহে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। অভি বললোমা এটা দেয়ালে লাগিয়ে দি? - বলে মায়ের অনুমতির অপেক্ষা না করেই সে দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে ভাতের হাঁড়ি থেকে কিছু ভাত নিয়ে এলো। এরপর মেঝেতে ছবিটা রেখে তার উল্টো পাশে ভাত লাগিয়ে সেটা দেয়ালের সাথে জুড়ে দিল।
পরদিনও জয়া তার স্কুলে পড়াতে গেল না। আদর করে খাইয়ে খুব যত্ন করে ছেলেকে স্কুলের জন্য তৈরি করলো
 বাসার বাইরে অপেক্ষায় থাকা স্কুল ভ্যানে ছেলেকে তুলে দিয়ে জয়া রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে চোখের আড়াল হওয়ার আগ পর্যন্ত তার ছেলেকে বহন করে নিয়ে চলা গাড়িটির দিকে চেয়ে রইলো
                                                                         
বিষণ্ণতা জয়াকে আস্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরেছে। বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে থাকা শক্ত মানসিকতার সেই নারীর চরিত্রটি জলাঞ্জলি দিয়ে পুরনো স্মৃতি হাতরে বাচ্চা মেয়ের মত করে জয়া ভাবতে লাগলো - সেই লালন মেলার মত করে ভিড় থেকে এসে বাবা যদি জড়িয়ে ধরে বলতেনআমি হারিয়ে যাই নি মা, হারিয়ে যাই নি 
আট বছর বয়সে একবার জয়া বাবার সাথে ছেঁউরিয়ার লালন আঁখড়াবাড়ির মেলায় গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল।
প্রচন্ড ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হন্নে হয়ে চারপাশে বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে সেই সময় ছোট্ট জয়ার মনে হয়েছিল বাবাকে সে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে, বাবাকে সে আর কোনদিনও খুঁজে পাবে না, কোনদিনও আর বাড়িতে ফিরতে পারবে না। কিন্তু জয়াকে ভুল প্রমাণিত করে হঠাৎ ভিড় থেকে বাবা জয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন, তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন আমি হারিয়ে যাই নি মা, হারিয়ে যাই নি। জয়া সেদিন পরম স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেদিন সে বাবার চোখেও পানি দেখেছিল।  
বাবা আছে কোন সমস্যা নেই - এই বিশ্বাস সেদিন জয়ার মনে গেঁথে গিয়েছিল। পরে বাবা বলেছিলেন, সেদিন তিনি ইচ্ছে করেই জয়াকে ছেড়ে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থেকে দেখছিলেন জয়া কেমন করে। বড় হওয়ার পর জয়া বুঝতে পারে; কেন সেদিন বাবার চোখে পানি এসেছিল।  
অনেক বছর আগের সেই রকমই ভয় আর আতংকের অনুভূতি আজ চারপাশ থেকে জয়াকে আঁকড়ে ধরেছে বাবা হয়তো কোন এক জায়গা থেকে সব দেখছেন, শুধু...। 
এত অপমান
, গ্লানি, আপনজনদের দূরে সড়ে যাওয়া এসব ছাপিয়ে জয়া আজ তার বাবার অভাবই গভীরভাবে উপলব্দি করতে লাগলো।
 আজ এই দুর্দিনে কেবলি মনে হতে লাগলো বাবা ছাড়া তার আপন বলতে আর কেউ ছিল না।

দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে
কিংকর্তব্যবিমূড় জয়া কান্ডজ্ঞান হারিয়ে সিদ্ধান্ত নিল এ জীবন সে আর রাখবে না। চারপাশের এতো গ্লানি, অপমানের তীব্রতা সেই মূহুর্তে এমনকি তার দুই সন্তানের কথাও ভুলিয়ে দিল। জয়া উদ্ভ্রান্তের মত ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। সৌভাগ্যক্রমে ছিটকিনি না দেয়া জানালার একটি পাল্লা লেগে না থেকে খুলে গেলো। ঘটনাচক্রে সেখানে উপস্থিত হয়ে সেই জানালা দিয়ে বাড়িওয়ালীর কাজের মেয়েটি দেখতে পেল তুলের উপর উঠে ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে তা গলায় পরার প্রস্তুতি নিতে থাকা জয়াকে। সে চিৎকার করে কি করতাছেন আপা? বলে জানালার কাছে গেলো। তার আর জয়ার উদ্দেশ্য বুঝার বাকি রইল না। মেয়েটি জোরে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সামনের দেয়ালে ভাত দিয়ে লাগানো তার ছেলের আঁকা ছবিটি জয়ার নজরে পড়ল। জয়া এ যাত্রায় নিজেকে নিবৃত করলো। মূহুর্তে সেখানে বাড়িওয়ালীসহ আরও কয়েকজন জড় হলেন।  

পরিস্থিতি শান্ত হলে বাড়িওয়ালী জয়াকে নানা রকম প্রশ্ন করা শুরু করলেন, নানা রকম অনুপ্রেরণা/উপদেশমূলক কথা বলতে শুরু করলেন। জয়া ঘরের মেঝেতে বসে চুপ করে রইলো, কোন কথার জবাব দিল না। কিছুক্ষণ পর অভি এলো স্কুল থেকে। জয়া অভিকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে জড়িয়ে ধরে বার বার চুমু খেতে লাগলো। অভি মায়ের এমন আচরণের কারণ কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। জয়া ভাবতে লাগলো কত বড় ভুলটাই না সে করতে যাচ্ছিল। একটু আগে পর্যন্ত যে জীবন জয়ার কাছে ছিল অতি
দুর্বিষহ, ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তার সেই জীবন যন্ত্রণা মুহুর্তে যেন ম্লান হয়ে গেল। মাতৃত্বের অপার অনুভূতি নিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে জয়া ভাবতে লাগলো তাকে বাঁচতে হবে, তাকে বাঁচতে হবে তার ছেলেমেয়েদের জন্য।           

বাড়িওয়ালী জয়াকে জানিয়ে দিলেন- তাকে আর এ বাসায় রাখা সম্ভব না। আজই তাকে এ বাসা ছাড়তে হবে। ওর যা মালপত্র আছে তা যেন সে আগামীকাল লোক পাঠিয়ে নিয়ে যায়। জয়াও কোন কথা না বলে ছেলেকে নিয়ে ইজি বাইকে চেপে কুমারখালীতে তার স্বামীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো, যেখানে তাকে নতুন করে আরও বড় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে।
জয়া চলে যাওয়ার পরদিনই বাড়িওয়ালী নতুন ভাড়াটিয়ার জন্য বাইরে বিজ্ঞাপন টাঙিয়ে দিলেন। দিন দশেক পরে সেই বাসায় এলো নতুন ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালী একদিন পর এলেন নতুন ভাড়াটিয়া দম্পতিটির বাসায় এসেই প্রথমে তিনি একটু আঁতকে উঠলেন যখন দেখলেন, যে আংটাটির ঝোলান ফ্যানে জয়া সুইসাইড চেয়েছিল সেখানে নতুন ভাড়াটিয়া মহিলাটি টুলের উপর উঠে রশি লাগাচ্ছে। অবশ্য পর মূহুর্তেই তার ভুল ভাঙলো, যখন দেখলেন মহিলাটি আসলে সেখানে পাটের রশির একটি দোলনা লাগাচ্ছে।
দোলনাটি লাগানোর পর বছর আটেকের একটি মেয়ে দোলনাটিতে বসে
পরলো, একই বয়েসী আরেকটি ছেলে দোল সংখ্যা গুনতে গুনতে তাকে দোল দিতে লাগলো
  
অতপর ভাড়াটিয়া মহিলাটি বাড়িওয়ালীকে বসতে দিয়ে তার স্বামীর সাথে বেশ উৎসাহ নিয়ে ঘর গুছাতে লাগলো। তিনি পরস্পরের প্রতি তাদের পরস্পরের রসায়ন উপলব্দি করার চেষ্টা করলেন। স্বামীটির বেশ ভালো চাকুরী - সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার, তাদের ছোট্ট দুটি জমজ ছেলে মেয়ে; পরিবারটিকে তার বেশ সুখিই মনে হলো। একটু অবাক হয়েই তিনি লক্ষ্য করলেন স্বামী-স্ত্রী দু
জনের চেহারাতেও খানিকটা মিল রয়েছে, যেন ভাইবোন! 
বাড়িওয়ালী তাদের অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে জিজ্ঞেস করলেন - বাসাটি কেমন লেগেছে
, পানির লাইনে ঠিকমত পানি আসছে কিনা...? দেখলেন সুন্দর ফ্রেমে তাদের বেশ বড় একটি পারিবারিক ছবি দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে রাখা। তিনি ভাবলেন, হয়তো তার ভয়ে ওরা ছবিটা দেয়ালে পেরেক ঠুকে টাঙ্গাতে পারছে না।
বাড়িওয়ালী ওদের অবাক করে দিয়ে নিজে একটি পেরেক আর তার পান বাটার হামান দিস্তাটি নিয়ে এসে পেরেকটি দেয়ালে ঠুকে ছেলেটিকে ছবিটা টাঙ্গিয়ে দিতে বললেন
বাড়িওয়ালী চলে যাওয়ার পর দম্পতিটি মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়ায় এত সুন্দর বাসা, বাড়িওয়ালীর সুন্দর অমায়ীক অচরণ এসব নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো। দোলনাটিতে ততক্ষণে ছেলেটি বসে পড়েছে, মেয়েটি দোল সংখ্যা গুনতে গুনতে তাকে দোল দিচ্ছে। পাশের দেয়ালে ভাত দিয়ে আটকানো জয়ার ছেলের আঁকা ছবিটি তখনো লাগানো। ছবিটির উপরের একটি কোণ খুলে ঝুলে আছে। ছবিটির দিকে এখনো কারো নজর পড়েনি। দেয়ালের এক কোণে অবহেলায় এঁটে থাকা জয়ার ছেলের পারিবারিক ছবিটি যেন তার বিপর্যস্ত পরিবারটির প্রতীক হয়ে রয়েছে।

মন্তব্য

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমার বন্ধু বিল

আজ থেকে ১৩ -১৪ বছর আগের কথা। আমেরিকার নিউজার্সি রাজ্যের বিল ওয়েস্টারম্যান নামের এক আমেরিকান ভদ্রলোক প্রথম বাংলাদেশে আসবেন। কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশে তাঁর পরিচিত কেউ নেই। মার্ক জুকারবার্গ তখনো ফেসবুক উদ্ভাবন করেন নি। তখন ছিল ইয়াহু মেসেঞ্জার।
বিল ইয়াহুতে কয়েকজন অপরিচিত বাংলাদেশীর সাথে যোগাযোগ করে তাঁদের সাথে বন্ধুত্ব পাতলেন। ইয়াহুতে ‘পাতানো’ বাংলাদেশী বন্ধুরা বিলকে বললো বাংলাদেশে আসলে এয়ারপোর্টে তারা তাঁকে ‘রিসিভ’ করতে যাবে। কিন্তু নির্ধারিত দিনে (ঢাকায়) বাংলাদেশে এসে বিমানবন্দরে বিল তাঁদের কারো টিকিটিরও দেখা পেলেন না...। * * * এই বিল ওয়েস্টারম্যানেরসাথে আমার পরিচয় ২০১৩’র মার্চে (চারটা বছর কেটে গেল!), এই ফেসবুকেই। কীভাবে? সে আরেক গল্প। বিলের সাথে পরিচয় হওয়ার আগে তাঁর ব্যাপারে আমি অনেক গল্প শুনেছিলাম। সারা পৃথিবীকে পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে চাওয়া অত্যন্ত স্বার্থবাদী-হিংস্র একটি রাষ্ট্র - আমেরিকা বলতেই আমাদের মাথায় এটা আসে না কি?
কিন্তু বিলের সাথে পরিচয় - একটু বন্ধুত্ব হওয়ার পর বুঝলাম আমেরিকা বিল ওয়েস্টারম্যানের মত আমেরিকানেরও রাষ্ট্র। আমরা প্রতিনিয়ত যাদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে চাই বিল তাদের…

বাবার বন্ধুর মেয়ে

জয়া আমার সাথে এমনভাবে কথা বলতো আমাকে যেন তার ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতে না হয়। করলেও বড়জোড় করতো প্রদীপ’দা বলে। জয়া আমার ছোটবোন মনিকার বান্ধবী। জয়ার আরোও একটি পরিচয় আছে। সে অনিল কাকুর মেয়ে, যিনি আমার বাবার খুব ঘনিষ্ট বন্ধু। যদিও বাবার সাথে অনিল কাকুর বন্ধুত্বটা খুব বেশী দিনের নয় কিন্তু অনিল কাকু তাঁদের বাড়ির প্রতিটি অনুষ্ঠানে বাবাকে নিয়ে যান, বাবাও তাঁকে আমন্ত্রিত করেন; আমাদের বাড়ির প্রতিটি অনুষ্ঠানে।

অনিল কাকু কোথাও দেখা হলে বন্ধুর ছেলে বলে আমায় খুব খাতির যত্ন করেন।আগে যেটা আমায় মারাত্মক অস্বস্তিতে ফেলে দিত। না, আমি অসামাজিক নই। তিনি আমায় খাতির যত্ন করেন আমারও অবশ্যই তাঁকে খাতির যত্ন করা উচিৎ। কিন্তু পারতাম না। না পারার কারণ, জয়া! ভয় পেতাম, আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত সন্মান পেয়েতিনি যদি ভেবে বসেন, 'এই ছেলে নির্ঘাত আমার কন্যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, তা না হলে এত সন্মান আসছে কোত্থেকে?'
আমি বাবাকেও অনেকবার বলেছিলাম -উনার সাথে অত বেশি না মিশতে।কারণ আমার ভয় হতো, অনিল কাকু যদি ভেবে বসেন, ‘এই লোক নির্ঘাত আমার কন্যাকে তাঁর পুত্রবধু করার ফন্দি আঁটছে, তা না হলে কীসের জন্য এত খাতির?’

কারো রুপের …