সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিজের কাছে ফেরা


সাদ্দামের নাম যে সাদ্দাম এটাও আগে আমি জানতাম না। জানলাম ওর মোবাইল নাম্বারটি যোগার করার জন্য যখন সফিকুলকে ফোন দিলাম। সফিকুল আমার স্কুল বেলার বন্ধু, সাদ্দামের মহাজন। সাদ্দাম সফিকুলদের ইটভাটায় পরিবহন শ্রমিকের কাজ করে।
তখন রাত ১০টা। ফোন দিয়ে আমি সাদ্দামের সাথে আমাদের আঞ্জলিক ভাষায় ক্যাজুয়াল আলাপ শুরু করলাম। সাদ্দাম আমার প্রতিটি কথার উত্তর দেয় আর বলে, আপনি কে? আপনার পরিচয়টা আগে দিন। আমি একটু ভয়ে ভয়ে বললাম, আমি প্রদীপ বলছি, গোপালপুর থেকে। আজ সকালে তোমার গাড়ী নিয়ে তুমি আমাদের বাড়ীতে ইট নিয়ে এসেছিলে। এবার চিনতে পেরেছ, আমি কে? সাদ্দাম এবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বলল, হ্যাঁ চিনেছি। কেন কল দিয়েছেন? আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?

আমি চোখ বন্ধ করে হড়বড় করে বলা শুরু করলাম
সাদ্দাম বছর খানেক আগে আমি তোমার সাথে একবার খুব খারাপ আচরণ করেছিলাম। আমি জানি আমার আচরণে তুমি খুব কষ্ট পেয়েছিলে। আমাকে ক্ষমা করে দিও ভাই। তুমি যদি বয়সে আমার চেয়ে ছোট না হতে আমি তোমার পা ধরে ক্ষমা চাইতাম।
সাদ্দাম এবার ওর কথায় হাসি মিশিয়ে বলল, কী যে বলেন! আমি তো সেদিনের কথা ভুলে গেছি। সেদিন আসলে আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। আমার সাথে সাহায্য করারও কেউ ছিল না, তাই একটু মাথা গরম ছিল। মাফ চাওয়ার কিছু নেই, আপনি আমার চেয়ে অনেক বড়। সেটা আমি তখনই ভুলে গেছি। -এ ছিল সাদ্দামের সাথে আমার কথোপকথনের চৌম্বক কিছু অংশের শুদ্ধ বাংলা সংস্করণ ।

সাদ্দামের কাছে এমনিতেই আমি ছোট হয়ে আছি। সে বলছে আমি ওর চেয়ে অনেক বড়, কিন্তু ১৬-১৭ বছরের এই ছেলেটার ইতিবাচক মানসিকতা, পরিনত কথাবার্তা, ভদ্র আচরণ দেখে নিজেকে আমার আরও অনেক ছোট মনে হতে লাগলো ।
এই সাদ্দাম বছর খানেক আগে আমাদের বাড়ীতে ইটভাটা থেকে ইট নিয়ে এসেছিল। সেদিন ইটগুলো কোথায় রাখা হবে এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বেশ কয়েকজনের সামনে তাকে আমি মারাত্মকভাবে অপমান করেছিলাম, শাসিয়েছিলাম। সেদিন আমার মত ক্ষমতাবানের সামনে সাদ্দাম একেবারে চুপসে গিয়েছিল। পরে- রাগ চলে গিয়ে অবশ্য আমারও ভেবে খুব খারাপ লাগছিল যে ছেলেটার সাথে ওরকম আচরণ না করলেও পারতাম।
খারাপ লাগা আরও দিগুন করে দিল পায়েলদি। যখন সে এসে আমাকে বলল, ওই ছেলেটির সাথে ওরকম করা আমার মোটেও ঠিক হয়নি। সেই ছেলেটি পরে দুঃখ করে বলেছে, বড়লোকেরা গরীবদের সবসময় শুধু পায়ের নিচে রাখতে চায়।
পায়েলদির কাছ থেকে একথা শুনে আমার কল্পনায় যেন সেই দৃশ্য ভেসে উঠলো- সাদ্দাম দুঃখ করে বলছে, 'বড়লোকেরা গরীবদের সবসময় শুধু।' পরে বাইরে এসে দেখি সাদ্দাম ততক্ষণে যথাস্থানে ইটগুলো গুছিয়ে রেখে চলে গেছে। ছেলেটার কাছে দুঃখ প্রকাশ/ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারলাম না বলে আমার মনে অপরাধবোধ প্রগাঢ়ভাবে জেগে উঠলো।
এরপর মাঝেমধ্যে আমার ওই দিনটির কথা মনে পড়ে আর মনটা খারাপ হয়ে যায়।
ঘটনাটির প্রায় এক বছর পর গতকাল সকালে তার সাথে আমার দেখা হলো। তার চেহারা আমার মনে আছে। সেও বেশ কয়েকবার আমার দিকে তাকালো। তার চোখের দৃষ্টি, আমার দিকে তার তাকানোর ভঙ্গি দেখে মনে হলো তার সাথে করা আমার দুর্ব্যবহারের কথা সে ভুলে নি। তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটি আমি ছাড়তে চাইলাম না। ভাবতে লাগলাম কিভাবে তাকে একা ডেকে এনে কথা বলা যায়। কিন্তু সেরকম কোন পরিস্থিতি তৈরি হলো না। সাদ্দামকেও খুব ব্যস্ত দেখাল। সে তার কাজ সেরে বিদেয় হলো। এবারো হলো না। সাদ্দামের কাছে ক্ষমা চাইতে না পারাটা আমার কাছে বোঝা হয়ে রইল, এ বোঝা আমি আর রাখতে চাইলাম না। সফিকুলের কাছে নাম্বার নিয়ে রাতে তাকে আমি কল দিলাম।

আমার সৌভাগ্য সাদ্দাম আমাকে ক্ষমা করেছে। জীবনে এ নিয়ে চতুর্থবার আমি কারো কাছে আমার কোন ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলাম। স্বজ্ঞানে এই চারবারই কাউকে আমি বাক্যবানে আঘাত করেছি। তবে একটা কথা আজ আমি স্পষ্টকরে বলতে চাই, এই চারবারের কোনবারই সব দায় আমার একার ছিল না (সাদ্দামের ক্ষেত্রেও না। সাদ্দাম সেদিন তার সীমা লঙ্ঘন করেছিল)। তবুও তাদের সবার কাছে আমি নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি।

কেন আমি এরকম করেছিলাম? আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলছি
এই চারজনের কোন জনের কাছে জীবনে কোন প্রয়োজনে আমাকে যেতে হবে সেরকম কোন সম্ভাবনা নেই। তবুও কেন? কারণ স্বজ্ঞানে- অজ্ঞানে অনেকেই আমার সাথে খারাপ আচরণ করেছে, আমাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলেছে। তারা কেউ কখনো আমাকে স্যরি বলে নি। তাদের কথা আমি যেভাবে মনে রেখেছিলাম, আমি চাই না আমার কথা সেভাবে কেউ মনে রাখুক।
আজ আমার খুব দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করতে ইচ্ছে করছে জীবনে কোনদিন যেন কোন ভুলের জন্য আমাকে আর কারো কাছে ক্ষমা চাইতে না হয়। আর যেন কাউকে বলতে না হয়- আমার চেয়ে তোমার বয়স কম না হলে আমি তোমার পা ধরে ক্ষমা চাইতাম। কীভাবে সম্ভব? উপায়টাও মনেহয় আমি বের করতে পেরেছি।

ইংরেজীতে একটা কথা আছে- 
People may hear your voice, they feel your attitude. সত্যিই তাই। আমরা মানুষের কথা শোনার সময় তাদের attitude টাও নিবিড়ভাবে উপলব্দি করার চেষ্টা করি। ওই উপলব্দিটাই সেই মানুষটা সম্পর্কে আমাদের মনে ধারণা তৈরি করে যে মানুষটি কেমন?

অত্যন্ত ধনী, সমাজে সেভাবেও পরিচিত এরকম কারো ধন সম্পদে তার চেয়ে নিচের ব্যক্তিদের ব্যাপারে সবসময় সচেতন থাকা উচিৎ। অর্থনৈতিকভাবে পিঁছিয়ে থাকা বন্ধুটি তার চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত এগিয়ে থাকা বন্ধুটিকে তার ৬টি ইন্দ্রিয় দিয়েই
আন্ডার অবজারবেশনে রাখে। ধনী বন্ধুটির কোন ব্যবহারে অহংকার প্রকাশ পাচ্ছে কি না, সে তাকে কোনভাবে ছোট করছে কি না। কী ভয়ংকর অবস্থা!

এমন কিছু বন্ধু আমারও আছে। বড্ড বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম যখন দেখলাম আমার কথার তারা অন্যরকম মানে করছে এবং আমার কথাগুলো তারা এমনভাবে ব্যাখ্যা করছে; আমার কোন পথ থাকছে না নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের। তারা সামনে এলে এখন আমি ভয় পেয়ে যাই। কথা বলি মেপে মেপে। চোখের দৃষ্টিও ফেলি অত্যন্ত সন্তর্পনে। আমার ভয় হয় পাছে ওরা বলে না বেড়ায়, “প্রদীপ দাম্ভিক দৃষ্টি নিয়ে তাকায়”!!! :'(
বরং আমার সাথে মিশতে গিয়ে যেন কখনো তারা ‘superiority complex’-এ না ভোগে এজন্য তাদের সাথে তাদের মত করে চলতে গিয়ে "সংকীর্নমনা"-এর তকমা পেয়েছি। :(
আসলেই তাই। তেলে জলে কখনো মিশ খায় না। যতই মেশাতে চাও না কেন। তেল জলের উপরে থাকবেই, জলের চেয়ে একটু চকচকও করবে বেশি।
এ নিয়ে অবশ্য আমার তেমন মাথাব্যথা নেই। কারণ আমি জানি আমি কেমন। এর জন্য আমার ঠাকুর’দার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাঁর ‘আশির্বাদে’ আমি এমনভাবে বড় হয়েছি আর যাই হোক স্বজ্ঞানে আমি অন্তত কখনো ধন সম্পদের অহংকার করতে পারি না। কারণ ধন -  সম্পদ কখন থাকবে, কখন থাকবে না I just don't know. 
আমার সেই সময়ের প্রতিটি অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল বন্ধু জানে আমি সবসময় ‘lower middle class value’ নিয়ে চলতাম। পোশাক - পরিচ্ছদ হতে শুরু করে জীবন যাপন, আমার সবই ছিল প্রায় খুব সাদামাটা, যেটা মোটেও হওয়ার কথা ছিল না।

আমার বেশিরভাগ বন্ধু অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ছিল। এদের বাড়ির ঘরগুলো ছিল খড় আর বাঁশের বেঁড়া দিয়ে বানানো। সেই ঘরে আবার একটি হেলানো বাঁশের সাপোর্ট, সাপোর্ট সরিয়ে নিলে দমকা হাওয়ায় ঘর ভেঙ্গে পড়বে। এরকম ব্যাকগ্রাউন্ডের কোন কোন বন্ধুকে আমার
সত্যজিৎ রায়ের "অপরাজিত"-এর অপুর মত মনে হতো। আমি কখনো চাইবো না কোন জনমে আমার এরকম জীবন হোক কিন্তু এরকম জীবন যাদের; আমি মনে তাঁদের জন্য কী পরিমান শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা লালন করি তা অক্ষরমালা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।
জীবনযাত্রা পরিচালনার জন্য আমি চাইলেই যে প্রচুর টাকা পেতাম তা নয়, কিন্তু চাইলেই যা পেতাম নিতাম তারচেয়েও অনেক কম। কে জানে আমার জীবনবোধ হয়তো "অপরাজিত"-এর "অপু"ময় বন্ধুবর্গের দ্বারা প্রগাঢ়ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। আমার সেই বন্ধুদের জীবনের ভেতরে একটু প্রবেশ করে দেখেছি, বেশি কিছু না শুধু একটু টাকার অভাবের জন্য এদের কী পরিমান অবহেলা, অবজ্ঞা, অপমান সইতে হয়। কতকিছু লুকিয়ে রাখতে হয়। সেই সময়গুলোতেই মনেহয় আমি টাকার মূল্য বুঝতে শিখেছিলাম। বুঝেছিলাম যে, টাকা মোটেও বিলাসিতার জন্য অবলীলায় খরচ করার জিনিস নয়, এটা কারো কারো জন্য অত্যন্ত অত্যন্ত অত্যন্ত প্রয়োজনের জিনিস।
এসব ভেবে আজ আমি আমার নিজের জন্য কিঞ্চিৎ গর্ব অনুভব করছি।   

এরপরও আমার সব আচরণ সবার কাছে ইতিবাচক ভাবে সমাদৃত নয়। আমার বাবার অনেক ধন - সম্পদ সেজন্য অনেক বিষয়ে আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। এই আত্মবিশ্বাস যাদের  কাছে অহংকার মনে হয়েছিল তাদের কাছে আমি করজোরে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং কথা দিচ্ছি, আমার এই আত্মবিশ্বাসের উদগিরণ আমি আমার নিজের কাছেই রেখে দেব -এটা আর বাইরে বের হবে না। 

কথাগুলো মোটেও philosophical না কিন্তু খুব সত্যি; আজ যা আমার গতকাল তা অন্য কারো ছিল, পরশু তা অন্য কারো হবে। আমরা পৃথিবীতে এসেছি খুব অল্প সময়ের জন্য। এই অল্প সময়টা হুট করে আরো অল্প হয়ে যেতে পারে। আমরা সবসময় মৃত্যুকে পাশে নিয়ে চলি। মৃত্যু যে কোন সময়ই আমাদের আলিঙ্গন করতে পারে। সমস্যা হলো আমরা কেউই তা বিশ্বাস করতে বাধ্য নই। একটু আগে হঠাৎ যে মারা গেল মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তাকে প্রশ্ন করা হলে সেও বলতো, আমি এখনই মরতে পারি না।
আমাদের মধ্যে আমরা যারা এখনো বিনয়ী হইনি, এখনো ভদ্র হই নি তারা সত্যিই বড্ড হতভাগা। তারা এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান দুটি জিনিস থেকে বঞ্চিত। সেই দুটো জিনিস হলো শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। আজকাল আমি সবসময় উপলব্দি করি এ দুটো জিনিস না পেয়ে যে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে, বৃথা তার এই পৃথিবীতে আসা।
অহংকারীরা সত্যিই করুণার পাত্র। অত্যন্ত বিনয়ী কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সামনে এলে শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। আগে ওনাদের আমি খুব হিংসে করতাম। আমার হিংসে হতো এই ভেবে যে, তাঁদের প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা সেটা আমার প্রতি অন্য কারো নেই কেন?
আমাদের প্রত্যেকেরই আমাদের জীবনের জন্য ঈশ্বরকে সবসময় ধন্যবাদ দেয়া উচিৎ। জীবনের টাফ টাইমে কখনোই বলা উচিৎ নয় ভগবান/আল্লাহ আমার সাথেই কেন এমন হবে??? আমাদের চারপাশেই অনেকে আছে যারা শারীরিকভাবে, পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দিন কাটায়। এদের সাথে এমন কেন হবে –এ প্রশ্নের উত্তর কি আমাদের কাছে আছে? লাল পিরিয়ড সবার জীবনে আসবে। এসি রুমে জন্মানো শিশুটিরও আসবে, নর্দমায় জন্মানো শিশুটিরও আসবে। কখন আসবে সেটা বলা মুশকিল কিন্তু আসবে অবশ্যই।
এবার একটু কঠিন কথা বলি। যার শুনতে খারাপ লাগবে তার কাছে আমি আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি…।
কাকে কষ্ট দিয়েছ, কাকে কথা দিয়ে আঘাত করেছ, সময়ের একটা বড় অংশ যদি তোমার এই চিন্তাতে কাটে তাহলে নিশ্চিত হয়ে যাও যে, তুমি হচ্ছো সুন্দর মনের একজন গর্ধভ।
তোমার একটি সুন্দর মন আছে এজন্যই তুমি সবার মন জুগিয়ে চলতে চাচ্ছো, কারো সাথে করা ছোট ছোট ভুলগুলো নিয়ে বড় পরিসরে অনুতাপ করো। তুমি গর্ধভ; এজন্যই বুঝতে পারছো না যে, সবার মন জুগিয়ে চলা সম্ভব নয়, চলা জরুরীও নয়। আর ভুলও তুমি একা করো না, সবাই করে। জরুরী হচ্ছে ‘ভুল করেছি’ বুঝতে পেরেও তুমি অনুতপ্ত কি না, ক্ষমাপ্রার্থী কি না?
কেউ কেউ আছেন যারা নিজেদেরকে নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশী ভালোবাসেন। এই মহাশয়রা মোমবাতির মতোও পুড়তে রাজি নন কিন্তু জ্বলতে চান সূর্যের মতো, সঙ্গিনীটিও চান পূর্নিমার চাঁদের মতো। বাস্তবতা থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থানকারী, হতাশাবাদী এই মহাশয়রা সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করার অলীক বাসনা চরিতার্থ করতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে অতীতে তাঁকে কে কী বলেছে, কে ভুল বলেছে, কে তাঁর জীবনে অনুপ্রেরণা যোগায় নি, কে বিশ্বাস করে নি যে তিনি পারবেন -এসব নিয়েই দিনরাত জাবর কাটেন।
দিন রাত শুধু ভাবেন কেউ তাঁর ভালো চায় না, সবাই তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে, সবাই শুধু হিংসা করে। নিজেদের ভুল নিয়ে ইনাদের ভাবার কোন ইচ্ছে নেই। নিজেকে নিজের সাহায্য করার মানসিকতা নেই।
যা করার নিজেকেই করতে হয়, কেউ করে দেয় না, তিনিও কাউকে করে দেন নি -অত্যন্ত বাস্তব এই কথাটি ইনারা বুঝতেও চান না মানতেও চান না। কারণ ওই একটাই- নিজেদেরকে ইনারা নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশী ভালোবাসেন।
এই মহাশয়দের মাথায় তুললে ইনাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। সামাজিকতা রক্ষার জন্য এই মহাশয়দেরকে জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া যাবে না কিন্তু সুস্থ্যশরীর - সুস্থ্যমন নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইলে মন-মস্তিষ্ক থেকে ইনাদের 'ফিল্টার করে' আউট করে দেয়া অত্যন্ত জরুরী।  


বাবা-মা অসন্মানিত হন, আমাদের কক্ষনো এরকম আচরণ করা উচিৎ নয়, এমনকি বাবা-মা ভুল করলেও নয়। পৃথিবীতে খারাপ মানুষের সংখ্যা অনেক কিন্তু একজনও খারাপ বাবা-মা নেই। বরং এই অসংখ্য খারাপ মানুষের মধ্যে আছেন একেকজন বাবা-মা। যাঁরা “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে” -এটা নিশ্চিত করতে গিয়ে খারাপ হন।
জীবন নিয়ে আমার ধারণা এখন অনেকটাই স্বচ্ছ। হয়তো একটু দেরি হয়ে গেছে কিন্তু সঠিক জীবন যাপনটাও মনেহয় আমি শিখে ফেলেছি। বিষয়গুলো অত্যন্ত common কিন্তু খুব significant. মিতভাষী হতে হবে, শান্ত থাকতে হবে। কে মরছে, কে লড়ছে, কে প্রেম করছে, কে ব্রেকআপ করছে, কে এখনো বিয়ে করছে না, কার এখনো কেন জব হচ্ছে না, কে হতাশার সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, কে আনন্দের আটলান্টিকে ভেসে বেড়াচ্ছে  –অন্যের কোন বিষয়ে কক্ষনো নাক গলানো যাবে না। অভিজ্ঞতা বলছে এতে শুধু নিজেকেই অপমানিত হতে হয়।
কাউকে সাহায্য করতে চাইলেও আগে তার অনুমতি নিতে হবে। কাউকে উপদেশ দেয়ার আগে ভাবতে হবে সেই উপদেশ দেয়ার যোগ্যতা আদৌ তোমার আছে কি না? কারণ মানুষ শুধু দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীদেরই উপদেশ শুনতে আগ্রহী, অন্য কারো নয়। সবারই নিজের নিজের যুদ্ধ থাকে। সেই যুদ্ধ তারা নিজেরাই করতে চায়। সেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তারা কখনো আহত হয়, কখনো হতাশ হয়, কখনো পরাজিত হয়, এরপর আবার ঘুরে দাঁড়াতে চায়। যেখান থেকে অনুপ্রেরণা নেয়া দরকার তারা নিজেরাই নেবে। তাদের কি করা উচিৎ, কি করা উচিৎ নয় এসব বিষয়ে কক্ষনো তাদের গায়ে পড়ে উপদেশ দিতে যাওয়া উচিৎ নয়। তাদের লড়াই তাদেরকেই লড়তে দিতে হবে।

কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কৌতূহল দেখানো যাবে না। তা সে যতবড় ঘনিষ্ট বন্ধুই হোক না কেন। শেয়ার করার মত হলে বন্ধু নিজেই এসে তা শেয়ার করবে। অহংকারের সংজ্ঞা বুঝতে হবে। তুমি অহংকারকে যেভাবে define করো অন্যেরা সেভাবে নাও করতে পারে। তোমার যে আচরণ তোমার কাছে স্বাভাবিক তা অন্যের কাছে “দাম্ভিক” মনে হতে পারে।।
আমি জেনেছি, সেটা ভালোবাসার-ই হোক বা প্রেমের, বন্ধুত্বের-ই হোক কিংবা দাম্পত্যের …সবগুলো সম্পর্কই একেকটি বৃক্ষের মত। শুরুতে যত্ন নিতে হয়, আগলে রাখতে হয়। এভাবে সময়ের সাথে সম্পর্ক নামের সেই বৃক্ষটির বিশ্বাস এবং ভরসার শেকড় যখন অনেক গভীর থেকে গভীরে চলে যায় ঝড় ঝাপটাও তখন তাকে টলাতে পারে না। যে কোন সম্পর্কেই ego নিয়ে বসে থাকা just মুর্খামী।
আর বুঝেছি, কোন কিছু নিয়ে আপসোস করা অত্যন্ত বোকামি। কারণ প্রতিটি দিনই একেকটি সুযোগ, প্রতিটি ভুল পদক্ষেপই একেকটি শিক্ষা। জীবনে যে কোন সময়ই যে কোন কিছু হতে পারে, এমনকি তখনও যখন মনে হবে জীবনে আর কিচ্ছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অনেক কথা বলে ফেললাম। কথাগুলো আমার নিজের জন্যই। তোমাদের উদ্দেশ্যে শুধু বলতে চাই, তোমরা যারা আমার কথায় প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছ। আমার ভুলের জন্য আমি বিবেকের দংশনে অনেকবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছি, তোমাদের কাছে অনেকবার ক্ষমা চেয়েছি কিন্তু তোমরা আমায় ক্ষমা করো নি, অভিমানের পাহাড় বানিয়ে বসে আছো। সেই পাহাড় ডিঙ্গানোর আর কোন ইচ্ছে আমার নেই (আগে ছিল)।
তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ ভবিষ্যতে কোনদিন তোমরা আমায় ক্ষমা করো না। যে ভালোবাসা, যে শ্রদ্ধা তোমরা আমায় দেখিয়েছ তার বদলে আমি যে বিশ্রী আচরণ তোমাদের সাথে করেছি তা আমি ভুলতে চাই না, আমৃত্যু মনে রাখতে চাই।
তোমাদের জীবনে এখন যে আঁধার তা একদিন কেটে যাবে, সফলতার আলোয় উজ্জল হয়ে উঠবে তোমাদের জীবন। জীবনটাকে তখন তোমাদের অনেক সুন্দর মনে হবে। আমার মধ্যে তখন তোমরা আর তেমন কোন দোষ খুঁজে পাবে না। তখন তোমরা আমার কাছে আসবে। কিন্তু বিশ্বাস করো তখন তোমাদের সাথে আর আমার বন্ধুত্ব হবে না।
ক’দিন আগে আমি সমুদ্র দেখে এলাম। নিজেকেও না আমার এখন কেমন যেন মহাসমুদ্রের মত মনে হয়। তিন-চার ফোঁটা দূষিত পানির যেমন সাধ্যি নেই মহাসমুদ্রকে দূষিত করার, তেমনি তোমাদের মত তিন-চারজনের সাধ্যি নেই আমাকে খারাপ মানুষ প্রমাণিত করার। আমি অত্যন্ত ভাল একটি ছেলে।:)  

পৃথিবীটা অনেক সুন্দর, জীবনটা আরো অনেক সুন্দর। জীবন নিয়ে আমার আর তেমন কোন অভিযোগ নেই। জুতো না থাকার দুঃখ আমার নেই, আমার পা আছে এই আনন্দে খালি পায়েই আমি লম্ফঝম্ফ করি। জীবনে সুখ-দু;খ দুটোই দেখেছি, দেখছি। আমার পায়েল 'দি, আমার পরিবার, আমার জীবন, আমার বন্ধুবান্ধব, আমার রুচিবোধ নিয়ে আমি অত্যন্ত সুখী। ঈশ্বরকে অনেক ধন্যবাদ ছোট্ট ছোট্ট কিছু দুঃখ, কিছু কষ্টসহ আমাকে এমন সুখী, সমৃদ্ধ, আনন্দময় জীবন দেয়ার জন্য।


মন্তব্য

নামহীন বলেছেন…
Very expressive.

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমার বন্ধু বিল

আজ থেকে ১৩ -১৪ বছর আগের কথা। আমেরিকার নিউজার্সি রাজ্যের বিল ওয়েস্টারম্যান নামের এক আমেরিকান ভদ্রলোক প্রথম বাংলাদেশে আসবেন। কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশে তাঁর পরিচিত কেউ নেই। মার্ক জুকারবার্গ তখনো ফেসবুক উদ্ভাবন করেন নি। তখন ছিল ইয়াহু মেসেঞ্জার।
বিল ইয়াহুতে কয়েকজন অপরিচিত বাংলাদেশীর সাথে যোগাযোগ করে তাঁদের সাথে বন্ধুত্ব পাতলেন। ইয়াহুতে ‘পাতানো’ বাংলাদেশী বন্ধুরা বিলকে বললো বাংলাদেশে আসলে এয়ারপোর্টে তারা তাঁকে ‘রিসিভ’ করতে যাবে। কিন্তু নির্ধারিত দিনে (ঢাকায়) বাংলাদেশে এসে বিমানবন্দরে বিল তাঁদের কারো টিকিটিরও দেখা পেলেন না...। * * * এই বিল ওয়েস্টারম্যানেরসাথে আমার পরিচয় ২০১৩’র মার্চে (চারটা বছর কেটে গেল!), এই ফেসবুকেই। কীভাবে? সে আরেক গল্প। বিলের সাথে পরিচয় হওয়ার আগে তাঁর ব্যাপারে আমি অনেক গল্প শুনেছিলাম। সারা পৃথিবীকে পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে চাওয়া অত্যন্ত স্বার্থবাদী-হিংস্র একটি রাষ্ট্র - আমেরিকা বলতেই আমাদের মাথায় এটা আসে না কি?
কিন্তু বিলের সাথে পরিচয় - একটু বন্ধুত্ব হওয়ার পর বুঝলাম আমেরিকা বিল ওয়েস্টারম্যানের মত আমেরিকানেরও রাষ্ট্র। আমরা প্রতিনিয়ত যাদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে চাই বিল তাদের…

বেঁচে থাকার গল্প

পাশে বসে অভি রংপেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকছে, জয়া তার বাবার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। বাবা রেগেমেগে বলছেন, ‘কী, এখন কেন এসেছিস? পালিয়ে যাওয়ার সময় মনে ছিল না? ভেবেছিস কি তুই? বাবার আমি কলিজার টুকরা, আজ না মানুক একদিন ঠিকই মেনে নেবে।কোনদিন না। মরে যা, জাহান্নামে যা; আর কক্ষনো আমার কাছে আসবি না...।’
অভি ওর আঁকা ছবিটি নিয়ে এসে বাবাকে দেখিয়ে বললো, ‘নানু দেখ, এটা বাবা, এটা মা, এটা আপু আর এটা...।’
বাবা বিরক্তি প্রকাশ করে খুব জোরে আঁকা খাতাটিসহ অভির হাত সরিয়ে দিলেন। আর তখনই একটু চমকে জয়ার ঘুম ভাঙ্গলো।ঘুম ভেঙ্গেই অন্ধকারে পাশ ফিরে সে অভিকে জড়িয়ে ধরলো।জয়ার মন বিষাদে ছেয়ে গেল। জয়া নিয়মিতই বিচিত্র রকম স্বপ্নে তার বাবাকে দেখে। সেই স্বপ্ন গুলো কখনোই সুখকর হয় না। ক’দিন আগের এক স্বপ্নে দেখেছিল উঁচু একটি ভবনের রেলিংয়ে সে ঝুলে আছে; চিৎকার করে বাবাকে ডাকছে। বাবা পাশে গম্ভীর মুখে তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন; তাকে বাঁচানোর কোন রকম চেষ্টা করছেন না!
আজকের দিনটি জয়ার বিশেষ দিন।আজ সে নতুন করে সংগ্রাম শুরু করার জন্য কুমারখালী থেকে কুষ্টিয়া সদরে যাচ্ছে। আজকেও বাবাকে স্বপ্নে এসে এভাবে বলতে হবে?
জয়ার চোখ ভিজে এলো, সে ছে…

বাবার বন্ধুর মেয়ে

জয়া আমার সাথে এমনভাবে কথা বলতো আমাকে যেন তার ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতে না হয়। করলেও বড়জোড় করতো প্রদীপ’দা বলে। জয়া আমার ছোটবোন মনিকার বান্ধবী। জয়ার আরোও একটি পরিচয় আছে। সে অনিল কাকুর মেয়ে, যিনি আমার বাবার খুব ঘনিষ্ট বন্ধু। যদিও বাবার সাথে অনিল কাকুর বন্ধুত্বটা খুব বেশী দিনের নয় কিন্তু অনিল কাকু তাঁদের বাড়ির প্রতিটি অনুষ্ঠানে বাবাকে নিয়ে যান, বাবাও তাঁকে আমন্ত্রিত করেন; আমাদের বাড়ির প্রতিটি অনুষ্ঠানে।

অনিল কাকু কোথাও দেখা হলে বন্ধুর ছেলে বলে আমায় খুব খাতির যত্ন করেন।আগে যেটা আমায় মারাত্মক অস্বস্তিতে ফেলে দিত। না, আমি অসামাজিক নই। তিনি আমায় খাতির যত্ন করেন আমারও অবশ্যই তাঁকে খাতির যত্ন করা উচিৎ। কিন্তু পারতাম না। না পারার কারণ, জয়া! ভয় পেতাম, আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত সন্মান পেয়েতিনি যদি ভেবে বসেন, 'এই ছেলে নির্ঘাত আমার কন্যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, তা না হলে এত সন্মান আসছে কোত্থেকে?'
আমি বাবাকেও অনেকবার বলেছিলাম -উনার সাথে অত বেশি না মিশতে।কারণ আমার ভয় হতো, অনিল কাকু যদি ভেবে বসেন, ‘এই লোক নির্ঘাত আমার কন্যাকে তাঁর পুত্রবধু করার ফন্দি আঁটছে, তা না হলে কীসের জন্য এত খাতির?’

কারো রুপের …